বাংলা সাহিত্য বিশ্বে ছড়িয়ে দিন

‘আমাদের ধ্রুপদী সাহিত্যসম্ভার বিশ্ব পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাপক হারে মানসম্মত অনুবাদ জরুরি। আমি প্রতিবারই যখন বইমেলায় আসি অনুবাদের ওপর খুব গুরুত্বারোপ করে থাকি। আমাদের গ্রন্থ, সাহিত্য যেমন অন্য ভাষায় অনুবাদ হবে তেমনি অন্য ভাষার সাহিত্যও বাংলা ভাষায় অনুবাদ হলে আমরা সে দেশের ভাষা-সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারব।’
সোমবার অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সব অর্জন ত্যাগের বিনিময়ে হয়েছে। কিন্তু কোনো ত্যাগই বিফলে যায়নি। ভাষার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছি আমরা, তার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার সম্মান লাভ করেছে।
তিনি বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণার উৎস। সারা বছরই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বসে থাকি, কখন এ মেলা শুরু হবে। এ আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছেন আমাদের ভাষা শহীদরা। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম, তখন আমার বন্ধু বেবী মওদুদসহ বাংলা একাডেমির লাইব্রেরি ব্যবহার করতাম। এটি আমার খুব প্রিয় একটি জায়গা।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘গ্রন্থমেলা এমনই একটি মেলা, এক মাস ধরে চললেও যেন আমাদের মন ভরে না। মনে হয় যেন আরও কিছুদিন চলুক। এ মেলা প্রবাসীদের মধ্যেও প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।’ এ সময় তিনি শিশুদের জন্য আরও বেশি বই প্রকাশের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু চুয়াত্তরে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসে বলেছিলেন, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি যেন শুধু শহরের পাকা দালানেই আবদ্ধ না হয়ে থাকে।’
মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য তার সরকার ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা গবেষণা ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে আমাদের সরকারের আমলে। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় এলো তখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের কাজটি তারা বন্ধ করে দিল। অথচ এখানে ভাষা নিয়ে নানা রকম গবেষণার কাজ এখন হচ্ছে। আমরা সরকারে আসার পরেই আবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের কাজ শুরু হয়েছিল।’
বাংলা একাডেমিকে হীরকজয়ন্তীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বছরই বঙ্গবন্ধু উত্থাপিত ঐতিহাসিক ছয় দফার ৫০ বছর বা সুবর্ণজয়ন্তী। যে ছয় দফা ছিল প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর এক দফা। অর্থাৎ স্বাধীনতার ঘোষণার প্রথম ধাপ। আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে বাংলা একাডেমি এবার একুশের মাসব্যাপী আলোচনায় ছয় দফাকে একটি আলোচ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারিত করেছে।’
বিকেল ৩টার পরই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্কৃতি সচিব বেগম আকতারী মমতাজ। স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী উপলক্ষে এবারের গ্রন্থমেলার মূল থিম ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী’।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘এটা শুধু গ্রন্থমেলা নয়, এটা বাঙালি জাতির মানসগঠনে ভূমিকা রাখে। বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এ গ্রন্থমেলার অবদান অপরিসীম। বইমেলা প্রাঙ্গণ লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের মিলনমেলার স্থল।’
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বইমেলার পরিসর বাড়ছে। যেভাবে বইমেলার পরিসর বাড়ছে তাতে বাংলা একাডেমির একার পক্ষে এ মেলার নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।’
সভাপতির বক্তব্যের পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। ১০ ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন কবি-সাহিত্যিকরা।
পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন- কবিতায় আলতাফ হোসেন, কথাসাহিত্যে শাহীন আকতার, প্রবন্ধে যৌথভাবে আবুল মোমেন ও ড. আতিউর রহমান, গবেষণায় মনিরুজ্জামান, অনুবাদে আবদুস সেলিম, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে তাজুল মোহম্মদ, আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা ও ভ্রমণ কাহিনী ক্যাটাগরিতে ফারুক চৌধুরী, নাটকে মাসুম রেজা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও পরিবেশে শরীফ খান এবং শিশুসাহিত্যে সুজন বডুয়া।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন ব্রিটিশ কবি ও জীবনানন্দ অনুবাদক জো উইন্টার, চেক প্রজাতন্ত্রের লেখক-গবেষক রিবেক মার্টিন, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সমিতির (আইপিএ) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক রিচার্ড ডেনিস পল শার্কিন এবং জোসেফ ফেলিক্স বুরঘিনো।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ শিক্ষক, গবেষক, কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভাষা শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী মেলা পরিদর্শনে যান।
নিহত ৫ পুলিশের পরিবারকে চেক প্রদান : বাসস জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্তব্য পালনকালে নিহত ৫ পুলিশ সদস্যের পরিবারকে ৪০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী সোমবার তার কার্যালয়ে পরিবারগুলোর কাছে চেক হস্তান্তর করেন। এ সময় তিনি শোকাহত পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ, স্বরাষ্ট্র সচিব মোজাম্মেল হক খান, আইজিপি একেএম শহীদুল হক, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

News Banglabd Design by
Website Mela